,


আফম মাহবুবুল হক দেশপ্রেমের এক দুর্লভ দৃষ্টান্ত

মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আফম মাহবুবুল হক দেশপ্রেমের এক দুর্লভ দৃষ্টান্ত। তিনি কখনো ব্যক্তিস্বার্থের সঙ্গে আপোস করেননি। সারা জীবন মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করে গেছেন। দেশের রাজনীতিতে মাহবুবুল হক সাহস, সততা, সত্যবাদিতা, দেশপ্রেমের এক দুলর্ভ দৃষ্টান্ত। তার রাজনৈতিক মেধা, প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অনন্য। আজকের আদর্শহীন ও ক্ষমতালোভী রাজনীতিতে তার মতো আপোসহীন নেতার বড় প্রয়োজন।

সদ্যপ্রয়াত মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষক আফম মাহবুবুল হক স্মরণে আয়োজিত ‘নাগরিক শোকসভায়’ এসব কথা বলেন বক্তারা।

রোববার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এই সভায় বিপ্লবী মাহবুবুল হককে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন তার সহকর্মী, সতীর্থ, বন্ধু ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা। এতে সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘মাহবুবুল হককে মিছিলে-সভায় রাজপথে দেখা গেছে। তিনি ছিলেন আজীবন যোদ্ধা। মানুষের মুক্তির জন্য, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়ে গেছেন। কখনো আপোস করেননি। দেশের স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, যা ধারণ করতেন, তাই বলতেন। তার মৃত্যুতে জাতি একজন আপোসহীন সংগ্রামীকে হারিয়েছে।’

একইসঙ্গে রাজনীতি করার কথা স্মরণ করে ‘নাগরিক ঐক্যের’ আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘মাহবুবুল হক এমন নেতা ছিলেন যিনি কখনো সাহস হারাতেন না। আহত অবস্থাতেও তিনি সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। ‘৭৩ সালে মাহবুবুল হক বিপুল ভোটে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। কিন্তু তার সে বিজয় ছিনতাই হয়ে যায়। তবু এ নিয়ে তাকে কখনো আফসোস করতে দেখা যায়নি।’

রাজপথে একসঙ্গে আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে যে নিউক্লিয়াস কাজ করতো তার অন্যতম কর্মী ছিলেন মাহবুবুল হক।’

তিনি আরও বলেন, ‘বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনে মাহবুবুল হকের আদর্শ সবসময় রাজনৈতিক কর্মীদের পথ দেখাবে।’

বাসদের আহ্বায়ক আফম মাহবুবুল হক (৬৯) গত ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ সময় সকাল সোয়া ১০টার দিকে কানাডার অটোয়ার সিভিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে গত ২৬ সেপ্টেম্বর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
শোকসভায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আসম আব্দুর রব বলেন, ‘মাহবুবুল হক ছিলেন একজন যোদ্ধা। তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী নেতা। তার সাহস, দৃঢ়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনি মিছিলেই নতুন নতুন স্লোগান তৈরি করতে পারতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা করতে পারতেন। ‘জয়বাংলা’ স্লোগানকে জনপ্রিয় করার পেছনে মাহবুবুল হক বড় ভূমিকা রেখেছেন।’

মুক্তিযুদ্ধ মাহবুবুল হকের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে রব বলেন, ‘ভারতের দেরাদুনে মুক্তিযোদ্ধদের প্রশিক্ষণের সময়ও তাদেরকে মানুষের মুক্তির কথা বলে উজ্জীবিত করতেন তিনি।’ শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের মাধ্যমে মাহবুবুল হকের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান জেএসডি সভাপতি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য হায়দার আকবর খান রনো বলেন, ‘গত শতাব্দীর ষাটের দশকে যেসব ছাত্রনেতা এ দেশের স্বাধীনতার জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন মাহবুবুল হক ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি নির্যাতিত হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, গুলিবিদ্ধ হয়েছেন—কিন্তু কখনো মানুষের মুক্তির আন্দোলন থেকে পিছু হটেননি।’

জাসদ একাংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, তিনি ও মাহবুবুল হক বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একই কমিটিতে ছিলেন। দুজনের গড়ন-মননে ভিন্নতা ছিল। সাংগঠনিক নানা সিদ্ধান্তে মতভেদ হতো। কিন্তু পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকায় তা কখনো তিক্ততার সৃষ্টি করেনি, এখনকার রাজনীতিতে যা বড় বিরল।

শোকসভায় দৈনিক সমকালের উপসম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, ‘মাহবুবুল হক উঠে এসেছেন নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। চাইলে ভালো অর্থনীতিবিদ বা আমলা হতে পারতেন। কিন্তু মানুষকে ভালোবেসে পরিবারের পিছুটানকে উপেক্ষা করে চিরদিন সংগ্রাম করে গেছেন। বর্তমান সংকটময় রাজনৈতিক পরিবেশে ও সাংস্কৃতিক দৈন্যদশায় তার মতো ব্যক্তিত্ব বড় প্রয়োজন।’
ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘মাহবুবুল হকের লড়াই ছিল মানুষের জন্য। তিনি চলে গেছেন কিন্তু তার আদর্শ ও সংগ্রামের ইতিহাস রেখে গেছেন। তাকে শ্রদ্ধা জানতে হলে তার কাজকে এগিয়ে নিতে হবে।’

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি শফিকুর রহমান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক সমাজ গঠনে মাহবুবুল হক যে আদর্শের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন তা ধারণ করতে হবে।’

প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে মাহবুবুল হকের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হবে।’ ২০০৪ সালে মাহবুবুল হকের ওপর হামলাকারীদের চিহ্নিত ও তাদের শাস্তিরও দাবি জানান তিনি।

শোকসভায় আরও অংশ নেন গণফোরামের অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিপিবির শাহ আলম, আব্দুস সালাম, মাহবুবুল হকের বন্ধু কামরুল হাসান প্রমুখ।

এবিসিবাংলা/এন.হাসান/ইমরান

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published.