ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পক্ষে ৬ দফা দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়েছে। টানা চার দিনব্যাপী সচিবালয় ও জাতীয় প্রেসক্লাব সংলগ্ন এলাকায় সড়ক অবরোধের পর অবশেষে সরকারের উচ্চপর্যায়ের আশ্বাসে রাজপথের কর্মসূচি আপাতত স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারী সমন্বয়ক মাহমুদুল হাসান বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য ছিল শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজমান বৈষম্য দূর করা এবং প্রশ্ন মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা। যেহেতু শিক্ষা উপদেষ্টা নিজ উদ্যোগে পাঁচ সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করেছেন, তাই আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আন্দোলন তিন সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখছি।'
শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ৬ দফা দাবির মূল বিষয়বস্তু
আন্দোলনকারীদের পেশ করা ৬ দফা দাবির মধ্যে প্রথম দাবিটি হলো উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ায় উত্তরপত্রের স্ক্যান কপি শিক্ষার্থীকে সরাসরি দেখার সুযোগ প্রদান করা। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বোর্ডের জন্য পৃথক প্রশ্নপত্র তৈরি করলেও কাঠিন্যের মান সমতায় আনতে কেন্দ্রীয় মডারেশন বোর্ড গঠন। তৃতীয় দাবি হলো সিলেবাসের অভ্যন্তরীণ শিখনফলের ওপর ভিত্তি করে সৃজনশীল ও বহুনির্বাচনী প্রশ্নের নম্বর পুনর্বিন্যাস। চতুর্থত, উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিক্ষকদের জন্য স্পষ্ট নম্বর প্রদানের গাইডলাইন বাধ্যতামূলক করা। পঞ্চমত, অসুস্থ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সময় ও শ্রুতিলিপিকার পাওয়ার শর্ত শিথিল করা। এবং ষষ্ঠ দাবি হলো পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচিতে পর্যাপ্ত বিরতি রাখা যাতে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারেন।
আমরা কোনো অহেতুক শিথিলতা চাই না। আমরা চাই প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধার সঠিক ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হোক। যখন ভিন্ন বোর্ডের প্রশ্নের মানের বিশাল পার্থক্য থাকে, তখন ফলাফলে চরম বৈষম্য তৈরি হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা কমিটি
শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞপ্তির পরপরই শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এক জরুরি সভা আহ্বান করেন। শিক্ষা বোর্ডের মহাপরিচালক, অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপকদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। উক্ত কমিটি আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিটি দাবির আইনি ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতা পরীক্ষা করে সুপারিশমালা জমা দেবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, শিক্ষার্থীবান্ধব যেকোনো যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর এবং চলমান অটোমেশন ব্যবস্থার আওতায় ফলাফল প্রক্রিয়াকরণে ডিজিটাইজেশন বাড়ানো হবে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের মতামত
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রাক্তন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাহমিদা সুলতানা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, 'পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে একই গণ্ডির মধ্যে ছিল। আন্তর্জাতিক মানের সাথে সংগতি রেখে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি ছিল। তবে হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন আনাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।' অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতিও মনে করেন, পরীক্ষা পেছানো বা ঘন ঘন নিয়ম বদলালে শিক্ষার্থীদের মনোবলে চাপ সৃষ্টি হয়, তাই স্থায়ী নীতি প্রণয়ন করা উচিত।
ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও শিক্ষা অঙ্গনে স্বাভাবিক পরিবেশ
কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণার পর রাজধানীর শাহবাগ, ধানমন্ডি ও প্রেসক্লাব এলাকার যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসে। বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষগণ শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। সমন্বয়ক দল পরিষ্কার জানিয়েছে, পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর যদি দাবির প্রতিফলন না দেখা যায়, তবে তারা দেশের সকল সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। আপাতত আগামী তিন সপ্তাহ ক্লাসে মনোনিবেশ ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষার্থী নেতারা।






