বাংলাদেশের অর্থনৈতিক টেকসই স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং ব্যাংক খাতের পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণের সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংক একগুচ্ছ নতুন সংস্কার রোডম্যাপ বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ঋণদাতা সংস্থা আইএমএফের (IMF) রিভিউ মিশনের সাম্প্রতিক সফর শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে যে, আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা না বাড়লে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে খেলাপি ঋণ (NPL) চিহ্নিতকরণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তিন মাসের বেশি অনাদায়ী ঋণকে মন্দ ঋণ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি ও নতুন ব্যাংক সংশোধন আইন

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি, যা মোট বিতরিত ঋণের প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি। আইএমএফ মিশন শঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, অবলোকন করা ঋণ এবং পুনঃতফসিল করা ঋণ হিসাব করলে প্রকৃত সংকটের মাত্রা আরও গভীরে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন' কঠোরভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে কোনো ব্যাংকের পর্ষদে একই পরিবারের দুজনের বেশি পরিচালক থাকতে পারবেন না এবং ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট জব্দ ও নতুন ব্যবসা চালুর ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।

আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংকিং সুপারভিশন নিশ্চিত করা হবে।

ব্যাংক একীভূতকরণ ও তারল্য সহায়তা নীতি

দুর্বল ও মূলধন ঘাটিতে থাকা ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অডিট ফার্মের মাধ্যমে নিরপেক্ষ সম্পদ মূল্যায়নের (Asset Quality Review) ব্যবস্থা করছে। যে সকল ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (CRAR) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যাসেল-৩ এর নিচে থাকবে, সেগুলোকে তুলনামূলক শক্তিশালী ও সুশাসিত ব্যাংকের সাথে একীভূত (Merger & Acquisition) করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে আমানতকারীদের স্বার্থ যাতে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ আমানত সুরক্ষা তহবিল জোরদার করছে।

অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন ও বাজার প্রতিক্রিয়া

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান স্মরণে অনুষ্ঠিত এক অর্থনৈতিক সেমিনারে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (PRI) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, 'আইএমএফের শর্ত পূরণের চেয়েও বড় বিষয় হলো আমাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থেই ব্যাংকিং খাতের ক্ষত নিরাময় করা প্রয়োজন। মুদ্রাস্ফীতি কমাতে হলে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংককে তারল্য জোগানো বন্ধ করতে হবে এবং সুদের হারকে বাজারভিত্তিক করে ঋণ প্রবাহকে সঠিক উৎপাদনশীল খাতে পরিচালিত করতে হবে।'